ভাষা বেছে নিন

বডি ফ্যাট ক্যালকুলেটর: শরীরের মেদের শতকরা হার মাপুন

ইউএস নেভি, আরএফএম বা স্কিনফোল্ড পদ্ধতির সাহায্যে আপনার শরীরের মেদের সঠিক পরিমাণ জানুন। ফ্যাট মাস, লিন মাস এবং ফিটনেস ক্যাটাগরি নির্ণয় করুন সহজেই।

Mehmet Demiray (মেহমেত দেমিরায়) প্রকাশিত আপডেট হয়েছে
শেয়ার করুন
ল্যারিংসের ঠিক নিচে
নাভি বরাবর, ফিতা সমতল রেখে
ঐচ্ছিক, ফ্যাট এবং লীন মাস যুক্ত করে

বডি ফ্যাট পার্সেন্টেজ বা শরীরের চর্বির শতকরা হার কী নির্দেশ করে

সাধারণ ওজন মাপার যন্ত্র আমাদের শরীরের মোট ওজন দেখায়। এই মোট ওজনের মধ্যে হাড়, পেশি, জল এবং চর্বি সবই অন্তর্ভুক্ত থাকে। শুধু ওজন দেখে বোঝা সম্ভব নয় যে শরীরে চর্বির পরিমাণ কতটুকু বা পেশির পরিমাণ কতটুকু। একজন ব্যক্তির ওজন ৭০ কেজি হতে পারে, কিন্তু তার শরীরের গঠন অনুযায়ী তিনি ফিট নাকি স্থূল, তা নির্ভর করে চর্বির শতকরা হারের ওপর। বডি ফ্যাট ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে খুব সহজেই ফ্যাট মাস এবং লিন বডি মাস আলাদা করে হিসাব করা যায়। লিন বডি মাস বলতে শরীরের চর্বিহীন অংশকে বোঝায়। যখন আমরা ওজন কমানোর চেষ্টা করি, তখন আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত চর্বি কমানো, পেশি নয়। শরীরের চর্বির সঠিক হিসাব জানা থাকলে খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়ামের পরিকল্পনা করা অনেক সহজ হয়। এটি আমাদের শারীরিক সুস্থতার একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূচক হিসেবে কাজ করে। নিয়মিত চর্বির মাত্রা পরিমাপ করলে ফিটনেস যাত্রার সঠিক অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

চর্বি মাপার চারটি জনপ্রিয় পদ্ধতির তুলনা

শরীরের চর্বি মাপার জন্য বডি ফ্যাট ক্যালকুলেটর প্রধানত চারটি পদ্ধতি ব্যবহার করে। প্রতিটি পদ্ধতির নিজস্ব সুবিধা রয়েছে। প্রথমটি হলো ইউএস নেভি পদ্ধতি, যা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই পদ্ধতিতে শুধুমাত্র একটি মাপার ফিতা বা টেপ দিয়ে ঘাড়, কোমর এবং নিতম্বের মাপ নিয়ে চর্বি হিসাব করা হয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে ইউএস নেভি পদ্ধতির মূল সূত্রটি নিচে দেওয়া হলো:

%BF=4951.03240.19077log10(waistneck)+0.15456log10(height)450\%BF = \frac{495}{1.0324 - 0.19077\log_{10}(\text{waist}-\text{neck}) + 0.15456\log_{10}(\text{height})} - 450

দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হলো রিলেটিভ ফ্যাট মাস বা আরএফএম পদ্ধতি। এটি শুধুমাত্র উচ্চতা এবং কোমরের মাপ ব্যবহার করে কাজ করে এবং এটি বেশ সহজ। তৃতীয়টি হলো বিএমআই পদ্ধতি, যা বয়স, লিঙ্গ, উচ্চতা এবং ওজনের ওপর ভিত্তি করে চর্বির একটি আনুমানিক হিসাব দেয়। চতুর্থ পদ্ধতিটি হলো জ্যাকসন-পোলক স্কিনফোল্ড পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ক্যালিপার নামের একটি যন্ত্র ব্যবহার করে শরীরের তিনটি নির্দিষ্ট অংশের চামড়ার ভাঁজ মেপে চর্বি নির্ণয় করা হয়। আপনার কাছে কোন সরঞ্জামটি আছে, তার ওপর ভিত্তি করে আপনি সুবিধাজনক পদ্ধতিটি বেছে নিতে পারেন।

সঠিকভাবে শরীরের মাপ নেওয়ার নিয়ম

বডি ফ্যাট ক্যালকুলেটর থেকে সঠিক ফলাফল পেতে হলে শরীরের মাপ নিখুঁতভাবে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। মাপার ফিতা ব্যবহার করার সময় খেয়াল রাখতে হবে ফিতা যেন সমান্তরাল থাকে এবং ত্বকের ওপর খুব বেশি চেপে না বসে বা খুব ঢিলা না থাকে। কোমরের মাপ নেওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষদের নাভি বরাবর এবং মহিলাদের কোমরের সবচেয়ে সরু অংশ বরাবর ফিতা ধরতে হয়। ঘাড়ের মাপ নেওয়ার সময় ফিতাটি গলার স্বরযন্ত্রের ঠিক নিচে রাখতে হবে। মহিলাদের ক্ষেত্রে নিতম্ব বা হিপের মাপ নেওয়া প্রয়োজন, যা নিতম্বের সবচেয়ে প্রশস্ত অংশ বরাবর নিতে হয়। পরিমাপ করার সময় সাধারণ অবস্থায় শ্বাস ছাড়তে হবে, পেট ভেতরের দিকে টেনে রাখা যাবে না। ভারী খাবার খাওয়ার পরপরই বা অতিরিক্ত ব্যায়াম করার পর মাপ নেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। স্কিনফোল্ড ক্যালিপার ব্যবহারের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র চামড়া এবং চর্বির স্তর চিমটি দিয়ে ধরতে হবে, ভেতরের পেশি যেন ধরা না পড়ে সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।

ফলাফল বোঝা এবং স্বাস্থ্যকর মাত্রা

ক্যালকুলেটরে তথ্য দেওয়ার পর এটি চর্বির শতকরা হার এবং এসিই বা আমেরিকান কাউন্সিল অন এক্সারসাইজ এর মানদণ্ড অনুযায়ী একটি ক্যাটাগরি দেখায়। এই ক্যাটাগরিগুলো লিঙ্গ ভেদে ভিন্ন হয়। বেঁচে থাকার জন্য শরীরের যে ন্যূনতম চর্বি প্রয়োজন, তাকে এসেনশিয়াল ফ্যাট বলা হয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে এটি ২% থেকে ৫% এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ১০% থেকে ১৩% পর্যন্ত হয়ে থাকে। যারা নিয়মিত খেলাধুলা করেন, তাদের চর্বির মাত্রা অ্যাথলিট পর্যায়ে থাকে। সাধারণ ফিটনেস বজায় রাখা পুরুষদের চর্বি ১৪% থেকে ১৭% এবং মহিলাদের ২১% থেকে ২৪% এর মধ্যে থাকে। গড় বা সাধারণ ক্যাটাগরিতে পুরুষদের চর্বি ১৮% থেকে ২৪% এবং মহিলাদের ২৫% থেকে ৩১% পর্যন্ত ধরা হয়। যদি চর্বির হার পুরুষদের ক্ষেত্রে ২৫% এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ৩২% এর বেশি হয়, তবে তা স্থূলতা বা ওবেস ক্যাটাগরিতে পড়ে। ফলাফলের সাথে মোট ওজনের কতটুকু চর্বি এবং কতটুকু পেশি, তার একটি পরিষ্কার হিসাব পাওয়া যায়। এই হিসাবটি নিয়মিত নথিবদ্ধ করে রাখলে স্বাস্থ্যের উন্নতি পর্যবেক্ষণ করা সহজ হয়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা বা এফএকিউ

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে চর্বি মাপার কোন পদ্ধতিটি সবচেয়ে বেশি নির্ভুল। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ডেক্সা স্ক্যানকে সবচেয়ে নির্ভুল ধরা হলেও, সাধারণ ব্যবহারের জন্য ইউএস নেভি এবং স্কিনফোল্ড পদ্ধতি বেশ নির্ভরযোগ্য। এই পদ্ধতিগুলোর ফলাফলে ডেক্সা স্ক্যানের তুলনায় ৩% থেকে ৫% এদিক সেদিক হতে পারে। আরেকটি সাধারণ প্রশ্ন হলো একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে আলাদা ফলাফল আসে কেন। এর কারণ হলো প্রতিটি পদ্ধতি আলাদা গাণিতিক সূত্র এবং শরীরের আলাদা অংশের মাপ ব্যবহার করে। তাই বিভ্রান্তি এড়াতে যেকোনো একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি বেছে নিয়ে নিয়মিত সেটি দিয়েই মাপ নেওয়া উচিত। অনেকেই জানতে চান তাদের বয়স ও লিঙ্গ অনুযায়ী চর্বির স্বাস্থ্যকর মাত্রা কত। সাধারণত ফিটনেস ক্যাটাগরির মধ্যে চর্বির মাত্রা ধরে রাখা স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে ভালো। বডি ফ্যাট ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে আপনি সহজেই আপনার বর্তমান অবস্থা জানতে পারবেন এবং একটি সুস্থ জীবনযাপনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবেন।

যেগুলোর উত্তর আমরা সবচেয়ে বেশি দিই।

বডি ফ্যাট মাপার জন্য কোন পদ্ধতিটি সবচেয়ে বেশি নির্ভুল?

বডি ফ্যাট ক্যালকুলেটর টুলে থাকা পদ্ধতিগুলোর মধ্যে স্কিনফোল্ড পদ্ধতি সাধারণত সবচেয়ে বেশি নির্ভুল ফলাফল দেয়। তবে সঠিকভাবে মাপার জন্য একটি ক্যালিপার প্রয়োজন। যদি আপনার কাছে ক্যালিপার না থাকে, তবে শুধুমাত্র মাপার ফিতা ব্যবহার করে ইউএস নেভি পদ্ধতি বা আরএফএম পদ্ধতি দিয়েও বেশ কাছাকাছি ও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব।

ইউএস নেভি পদ্ধতিতে মাপার জন্য কোমর ও ঘাড় কীভাবে সঠিকভাবে মাপতে হয়?

ঘাড় মাপার সময় ফিতাটি গলার সামনের উঁচু অংশের ঠিক নিচে রেখে সোজাভাবে মাপ নিতে হবে। কোমর মাপার ক্ষেত্রে পুরুষদের নাভির ঠিক ওপর দিয়ে এবং মহিলাদের পেটের সবচেয়ে সরু অংশ বরাবর ফিতা পেঁচিয়ে মাপতে হয়। ফিতা যেন ত্বকের সাথে লেগে থাকে কিন্তু খুব বেশি আঁটসাঁট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

পুরুষ ও মহিলাদের জন্য স্বাস্থ্যকর বডি ফ্যাট বা শরীরের চর্বির হার কত হওয়া উচিত?

আমেরিকান কাউন্সিল অন এক্সারসাইজ অনুযায়ী সাধারণ ফিটনেস বজায় রাখার জন্য পুরুষদের বডি ফ্যাট ১৪% থেকে ১৭% এবং মহিলাদের ২১% থেকে ২৪% এর মধ্যে থাকা আদর্শ। তবে যারা নিয়মিত খেলাধুলা বা অ্যাথলেটিকস করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই হার আরও কম হতে পারে। মহিলাদের শরীরে প্রাকৃতিকভাবেই চর্বির পরিমাণ কিছুটা বেশি থাকে।

একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদ্ধতিতে বডি ফ্যাটের পরিমাণ আলাদা আসে কেন?

প্রতিটি পদ্ধতি শরীরের চর্বি অনুমান করার জন্য ভিন্ন ভিন্ন সূত্র ও পরিমাপ ব্যবহার করে। যেমন বিএমআই পদ্ধতি শুধুমাত্র আপনার বয়স, উচ্চতা ও ওজনের ওপর নির্ভর করে যা পেশিবহুল শরীরের ক্ষেত্রে ভুল ধারণা দিতে পারে। অন্যদিকে ফিতা বা ক্যালিপার ভিত্তিক পদ্ধতিগুলো সরাসরি শরীরের আকার ও চর্বির স্তর মাপে বলে ফলাফল কিছুটা আলাদা হয়।

ওজন মাপার যন্ত্র ছাড়াই কি শরীরের চর্বির পরিমাণ জানা সম্ভব?

হ্যাঁ, বডি ফ্যাট ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে ওজন ছাড়াই চর্বির শতকরা হার জানা সম্ভব। আরএফএম বা ইউএস নেভি পদ্ধতিতে শুধুমাত্র উচ্চতা এবং ফিতা দিয়ে কোমর, ঘাড় ও নিতম্বের মাপ নিলেই ফলাফল পাওয়া যায়। তবে চর্বি ও পেশির সঠিক ওজন কেজিতে জানতে চাইলে শরীরের মোট ওজন ইনপুট দেওয়া প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য সচেতনতার ক্ষেত্রে বিএমআই-এর চেয়ে বডি ফ্যাট শতাংশ জানা বেশি গুরুত্বপূর্ণ কেন?

বডি মাস ইনডেক্স বা বিএমআই শুধুমাত্র উচ্চতা ও ওজনের অনুপাত হিসাব করে। এটি শরীরের পেশি ও চর্বির পার্থক্য বুঝতে পারে না। ফলে একজন পেশিবহুল সুস্থ মানুষকেও বিএমআই স্থূলকায় হিসেবে দেখাতে পারে। বডি ফ্যাট ক্যালকুলেটর সরাসরি চর্বির পরিমাণ নির্দেশ করে বলে এটি ফিটনেস ও স্বাস্থ্যের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে অনেক বেশি কার্যকরী।

তথ্যসূত্র

  1. Body fat percentage · Wikipedia
  2. Relative fat mass (RFM) as a new estimator of whole-body fat percentage · Scientific Reports · Woolcott OO, Bergman RN · 2018
  3. Body mass index as a measure of body fatness: age- and sex-specific prediction formulas · British Journal of Nutrition · Deurenberg P, Weststrate JA, Seidell JC · 1991
  4. Generalized equations for predicting body density of men · British Journal of Nutrition · Jackson AS, Pollock ML · 1978